আন্তর্জাতিক

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় এক বাংলাদেশী প্রবাসীর মৃত্যু!! “মরণের আগে আমার মানিকরে আমার বুকে নিয়ে মরতে চাই…

ছোট্ট একটি ঘরে বসে আহাজারি করে কাঁদছিলেন পঁচাত্তরোর্ধ্ব পরশমণি বিশ্বাস। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘তোমরা আমার বুকের মানিককে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। আমি আর কিছু চাই না। মরণের আগে আমার মানিকরে আমার বুকে নিয়ে মরতে চাই।’

পরিবার পরিজনের জন্য একটু সচ্ছল জীবন নিশ্চিত করতে প্রতিবছর জমি-জমা বিক্রি করে হাজার হাজার মানুষ যায় সৌদি আরবসহ বিশ্বের নানা দেশে। কিন্তু নির্ভরতার এই জীবনটাই যদি চলে যায়, তবে আহাজারি আর মাতম করা ছাড়া কী বা করার থাকে?

এমনই মাতম চলছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার রামশংকর গ্রামের পাভেল চন্দ্র বিশ্বাস পাপ্পুর (২৪) বাড়িতে। সৌদি আরব প্রবাসী পাভেল এক সড়ক দুর্ঘটনায় গত শনিবার রাত ১১টায় নিহত হন।

পাভেল সৌদি আরবে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। শনিবার রাতে কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন তিনি। রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি প্রাইভেটকারের চাপায় মৃত্যু হয় তাঁর।

মৃত্যুর খবর দেশে আসার পর থেকেই স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ি। তাঁর পরিবার দাবি জানিয়েছেন, যাতে পাভেলের মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনা হয়। তাঁকে শেষ দেখা দেখতে চান তাঁর স্বজনরা।

এ জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পরিবারের অভাব অনটনের কারণে বাবার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতে হয় পাভেলকে। তারপর বিভিন্ন জায়গা থেকে টাকা ধার করে প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ করে ছয় মাস আগে যান সৌদি আরব।

সেখানে গিয়ে কাজ নেন কাঠমিস্ত্রির দোকানে। নিজের খরচ বাদ দিয়ে এ পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিলেন। আশা ছিল, ধার শোধ হয়ে গেলেই সুখের মুখ দেখবে পরিবার। কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। শনিবার রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে ফোনে ভেসে আসে তাঁর মৃত্যুর খবর।

প্রিয় সন্তানের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে মা অর্চনা আর বাবা কৃষ্ণ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফেরার পর আবারও বুকফাটা আর্তনাদ। মুখে একই বুলি, তাঁরা তাদের প্রিয় সন্তানের মুখ দেখতে চান শেষবারের মতো। ঘরের বারান্দায় লুটিয়ে পড়ে তাদের এই বিলাপ পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা পথচারীদেরও থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি তাঁরাও ছুটে আসেন। শোনান সান্ত্বনার বাণী। কিন্তু সন্তান হারানোর বেদনা কি মুখের বাণীতে ভোলা যায়?

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার রামশংকর গ্রামের বাসিন্দা পাভেল চন্দ্র বিশ্বাস। ছবি : সংগৃহীত

ঘরের এককোণে বিলাপ করছিলেন ভৈরব সরকারি জিল্লুর রহমান কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষে পড়ুয়া পাভেলের ছোট বোন মনীষা রানী বিশ্বাস। তাঁকে শান্ত করতে সমবয়সী স্বজন-বন্ধুরা শত চেষ্টা করেও পারেনি। মনীষা তাঁর ভাইকে চান। আর কিছু নয়।

বসতঘরের মুখোমুখি অপর একটি ছোট্ট ঘরে বসে অনবরত কাঁদতে থাকেন পাপ্পুর দাদি পরশমণি বিশ্বাস।

পাপ্পুর বড় ভাই রুবেল চন্দ্র বিশ্বাস (২৬) চাকরি করেন একটি বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টের এজেন্সিতে। তিনি জানান, তিনি বড় সন্তান হলেও পাভেলই ছিলেন সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আর এজন্যই পরিবার ওর ওপর ভর করে এতগুলো টাকা ঋণের ভার নিয়েছিল। এখন পুরোটাই দেনা হয়ে গেল।

তবে তিনি বলেন, টাকার ঋণও হয়তো কোনো না কোনোভাবে কোনো একদিন শোধ হবে। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ভাইটি! তাঁকে কি ফিরে পাবেন!

রুবেল জানান, পাগলপ্রায় মা, বাবা, বোন আর বৃদ্ধ দাদিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পাভেলের লাশ ফিরিয়ে আনতেই হবে। তাঁরা শেষবারের মতো ওর মুখ দেখে শেষকৃত্য করতে চান। আর এ জন্য তিনি দেশবাসী, প্রবাসীসহ সরকারের আন্তরিক সহায়তা কামনা করেন।

দরিদ্র পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে সুদূর প্রবাসে পাড়ি দিয়ে মৃত্যুবরণ করা পাভেল বিশ্বাসের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রতিবেশী পরিমল বিশ্বাস, অন্তু ও শিখা রানীও সরকারের প্রতি দাবি জানান, পাভেলের মরদেহটি সরকারি উদ্যোগে যেন স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close