জাতীয়

এক হাতে হ্যান্ডেল অন্য হাতে পেডেল, তবুও জীবন কিন্তু থেমে নেই…..

আবুল কালাম ছিলেন সামর্থ্যবান এক যুবক। যিনি অন্যের জমি পত্তন নিয়ে চাষাবাদের পাশাপাশি বাড়িতে গরু পালন করে সুখের একটি সংসার গড়েছিলেন।

২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বগুড়ার নন্দিগ্রাম থেকে ভটভটিযোগে বাড়ি ফেরার পথে বিপরীতমুখী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায় তাঁর। নানা চিকিৎসার পরও আর দাঁড়াতে পারেননি। সেই থেকে রিকশা-ভ্যানে শুয়েই হাত দিয়ে পেডাল করে ভিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে চলছে তাঁর জীবন।
কালামের পরিবার ও গ্রামবাসী সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কাপাসঠিকরি (ধাওয়াপাড়া) গ্রামের দিনমজুর আবুল কালাম অন্যের জমিতে ঘর নির্মাণ করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন। শারীরিক সামর্থ্যবান যুবক কালাম পরিশ্রম করেই গড়েছেন সচ্ছল সংসার। ২০০৭ সালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের শাহজালালের মেয়ে জহুরা বেগমকে বিয়ে করার পর স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সংসারে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতেন। চাষবাস ছাড়াও গরু, হাঁস-মুরগি প্রতিপালন করে তাঁরা সংসারে আয় করতেন। ২০০৮ সালে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় একমাত্র সন্তান সিয়াম।

কিন্তু জন্মের কয়েক মাস পরই সিয়াম আক্রান্ত হয় থ্যালাসেমিয়া রোগে। তখন সন্তানকে সুস্থ করতে কালাম ছুটে বেড়ান বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছে। এতে তাঁর অনেক খরচও হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হওয়ার পর থেকে ছেলের পরিবর্তে নিজের চিকিৎসার জন্য পড়ে থাকতে হয় হাসপাতালে। তখন চরম অর্থসংকটে পড়েন কালাম। নানা চেষ্টার পরও পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় তাঁকে। থমকে যায় তাঁর জীবনের সব পরিকল্পনা।
বিপন্ন জীবনে সন্তান ও সংসারের ভার বহনের ক্ষমতা হারিয়ে কালামের জীবন কাটছে এখন হাত দিয়ে পেডাল করা তিন চাকার রিকশা-ভ্যানে। কালামের কষ্ট দেখে তিন চাকার ওই রিকশা-ভ্যান দান করেছিলেন তাঁর শ্বশুরবাড়ি এলাকার সাখাওয়াত আলী নামের এক ব্যক্তি। কোমর থেকে দুই পা অবশ হয়ে ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে গেছে তাঁর। দিন-রাত শুয়ে থাকার কারণে পায়ের হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে কখনো কখনো অঝোরে কাঁদেন কালাম। হাত দিয়ে পেডাল করার কারণে হাতের তালু শক্ত কাঠের মতো হয়ে গেছে। তার পরও থেমে নেই ছেলেকে বাঁচানোর আকুতি। সহযোগিতার জন্য ভ্যানের বডির সঙ্গে অসুস্থ ছেলে সিয়ামের লেমিনেট করা ছবিও ঝুলিয়ে রেখেছেন তিনি।

সিয়ামকে প্রতি মাসে রক্ত দিতে হয়। বগুড়ার একটি হাসপাতালে গিয়ে এই রক্ত দিতে তাঁর খরচ হয় কমপক্ষে দেড় হাজার টাকা। দীর্ঘ আট বছর ধরে পঙ্গুত্বের এই দুর্বিষহ জীবনের পাশাপাশি অসুস্থ ছেলের ভার আর সইতে পারছেন না কালাম। হাতের ওপর ভর করে রিকশা-ভ্যানে চলার শক্তিও দিনে দিনে কমে যাচ্ছে তাঁর। পঙ্গু হলেও থেমে নেই জীবন। এখন ২৪ ঘণ্টাই কালামের জীবন কাটছে ওই তিন চাকার রিকশা-ভ্যানের ওপর। বর্তমান বাজারে ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান পাওয়া গেলেও কেনার সামর্থ্য নেই তাঁর। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধরনা দিলেও স্বাচ্ছন্দ্যে চলার কোনো সহযোগিতা মেলেনি কালামের। ক্ষেতলালের স্থানীয় এক সংবাদকর্মীর সহযোগিতায় স্থানীয় সমাজসেবা অফিস থেকে প্রতি মাসে ৭০০ টাকা সরকারি পঙ্গু ভাতা এখন কালামের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এর পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে যে সহযোগিতা মেলে তাই দিয়ে তিনজনের সংসার চলে। দুর্মূল্যের এ বাজারে তাঁর যে কত কষ্ট তা কালাম হাড়ে হাড়ে টের পান।

কালাম বলেন, ‘আট বছরের দুর্বিষহ পঙ্গুত্বের জীবন নিয়ে আর চলতে পারছি না। ছোটবেলা থেকেই মানুষের বাড়িতে কামলা দিয়ে অনেক পরিশ্রম করে সংসার গড়েছিলাম। স্বামী-স্ত্রী মিলে সুখের সংসার গড়েছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল, ভটভটিতে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনা আমার পুরো জীবন ওলটপালট করে দিল। ’ তিনি বলেন, ‘দুটি পা অবশ হয়ে গেছে। পঙ্গু জীবন নিয়ে এখন আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না। পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। ভ্যান টানতে টানতে হাতও পাথর হয়ে গেছে। পঙ্গু শরীরে আর কিছুই করার নেই। তাই কষ্ট হলেও হাত দিয়ে পেডাল করে রিকশা-ভ্যানে দিনের পর দিন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। বলতে গেলে ভ্যানই এখন ঘরবাড়ি। এখন পঙ্গু মানুষের চলাফেরার জন্য যান্ত্রিক অনেক বাহন পাওয়া যায়। সেগুলো কেনার সামর্থ্য আমার নেই। তাই শত কষ্ট হলেও হাতের ওপর ভর করেই বেঁচে থাকতে হচ্ছে। ’ কালামের স্ত্রী জহুরা বেগম বলেন, ‘একে তো স্বামী পঙ্গু, তার ওপর একমাত্র সন্তানের থ্যালাসেমিয়া রোগ। দীর্ঘ আট বছর ধরে স্বামী ও সন্তানের এই অবস্থা। নিজের সম্বল বলতে কিছুই নেই। বসতভিটাও অন্যের জায়গায়। এই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না। ’

ক্ষেতলাল কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সংবাদকর্মী আজিজার রহমান জানান, ‘কালামের এ অবস্থা দেখে স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করে পঙ্গু ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুস্থ করার ব্যাপারে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় চিকিৎসা নিয়ে লাভ হবে না জেনে আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলাফেরার জন্য যান্ত্রিক কোনো বাহনের ব্যবস্থা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read In English»
Close