জাতীয়

মধ্যবিত্তের জন্য শুধু অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তা

গত শতাব্দীর শেষ প্রজন্মের একজন আমি। ৯০ দশকের মাঝামাঝি স্কুল পাশ করেছি। আমাদের স্কুল মানে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নানান বিজ্ঞাপনে ঠাসা ফ্ল্যাট বাড়ি নয়। আমাদের স্কুলে ছিলো দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠ আর গাছগাছালিতে ভরা। ক্লাসরুমের ছাদছোঁয়া জানালা দিয়ে উপচে পড়তো রোদ্দুর। আর মনটা পড়ে থাকতো দূরের ওই মাঠে। ক্লাস শুরুর আগে-পরে অথবা টিফিনের ফাঁকে চলতো ছোঁয়াছুঁয়ি, দারিয়াবান্ধা, গোল্লাছুট থেকে শুরু করে ফুটবল, হ্যান্ডবল, ভলিবল, বাস্কেটবল পর্যন্ত। তখনো তেমন জমে ওঠেনি ক্রিকেট, তবে ফাঁকে ফাঁকে চলতো সেটাও।

যে স্কুলে এতো খেলাধুলার ব্যবস্থা, ভাবছেন সেখানে লেখাপড়া হতো কখন? ওই চলতো আর কি খেলাধুলার ফাঁকে ফাঁকে। আর আমি বা আমার মতো যারা ছিলাম তাদের জন্য ছিলো বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, দেয়াল পত্রিকা এবং স্কুলের শেষ দেয়ালের ওপাড়ে ধূমপান প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তবে পড়তেও হতো নিয়ম করে। মনিরউল্লা, সচিন্দ্র বাবু কিংবা সিরাজ স্যারের ছাত্র যারা তাদের কি না পড়ে উপাই ছিলো?

মনিরউল্লা স্যারকে দেখলে পা কাঁপতো না এমন ছাত্র গোটা স্কুলে ছিলো না। অথচ এই মানুষটা কোন দিনও কোন ছাত্রের গায়ে হাত দিতেন না। বাংলা স্যার সচিন্দ্র বাবু বছরে একদিন একটা থাপ্পর দিতেন, বাকি ৩শ’৬৪ দিন আমরা সোজা থাকতাম। উনি ছিলেন বলেই হয়তো আজ আমি টানা বাংলা লিখে যেতে পারছি। যাই হোক, সিরাজ স্যার ইংরেজি পড়াতেন। ভীষণ রোমান্টিক মানুষটি সবসময় সাদা সার্ট আর কালো প্যান্ট পড়তেন। কোনদিন সরিষাবিন্দু ময়লা দেখিনি তার সার্টে।

আমাদের স্কুলই ছিলো সব। সেই প্রথম দিন মা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ওয়ানে ভর্তি করে দিয়ে এসেছিলেন আর ফেরার পথে উপদেশ ছিলেন, বন্ধুদের সাথে দূরে কোথাও যাবে না, ছেলেধরা আছে। অপরিচিত কারো কাছ থেকে কিছু খাবে না। ব্যাস ওইটুকুই। আজ অব্দি চলছি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে নাইন-টেন এ ওঠার পরও আমাদের সারা বছরের বেতন ছিলো জরিমানাসহ ৪শ’ দশ টাকা। (আমর স্কুল কিন্তু সরকারি ছিলো না) তারমধ্যে খেলাধূলা, সাহিত্য চর্চা কিংবা ভালো ছাত্র হলে বিশেষ ছাড় দেয়া হতো।

স্কুল বাণিজ্যটা তখনো সেভাবে জমে ওঠেনি কিনা তাই। সবে দু একটা কিন্ডার গার্টেন হয়েছে। ভাগ্যিস সেসব অভিভাবকদের বেশীরভাগই আর জীবিত নেই। থাকলে তাদের বিস্ময়ের সীমা থাকতো না। ফ্ল্যাট বাড়িতে আবার স্কুল হয় নাকি? এই ভেবে নিশ্চই তারা হাসতে হাসতে খুন হতেন। কেউ কেউ যদি নাও হতেন তবে আমি নিশ্চিত শিশুদের লেখাপড়ার খরচ জানলে অক্কা পেতেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়া আমি এখনো মধ্যবিত্তই আছি। সম্মানজনক পেশায় স্বাচ্ছন্দে চলতে পারি। আমার বন্ধু-বান্ধব আত্বীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তারাও মধ্যবিত্ত।

জানুয়ারিতে দেখলাম কম-বেশী সবার ভেতরেই চাপা আতঙ্ক। আমাদের সময় পাশ করলেই পরবর্তী ক্লাসে ওঠা যেতো। এখন তা নয়। প্রতিবছর নতুন করে ভর্তি হতে হয়। বই-পুস্তক, স্কুলড্রেস, ব্যাগ, টিফিনবক্স সব মিলিয়ে বছরের শুরুতে বেশ বড় ধাক্কা। আর যাদের দুই বাচ্চা স্কুলে পড়ে তাদের তো ভীষণ কাহিল অবস্থা। সবাই ভদ্রলোক, কেউ কারো কাছে হাত পাততে চান না। আর তাছাড়া বাজারে গল্প আছে আজকাল নাকি ধার দিলে ফেরত পাওয়া যায় না। খুব খেয়াল করছি, কেউ কেউ স্ত্রীকে বলছেন কোন চিন্তা করো না ব্যবস্থা হয়ে যাবে। স্ত্রীও লক্ষ্য করছেন, স্বামী তার সারারাত শুধু এপাশ ওপাশ করছেন ঘুম আর আসছে না। অগত্যা কেউ কেউ হয়তো পাশেরজনের কানে কানে খুব গোপনে বলছেন, ভাইরে এক দম ফেঁসে গেছি, কাল পরশুর মধ্যে যেমন করেই হোক বাচ্চাটাকে ভর্তি করতেই হবে।

এমন ফিসফিসানি প্রতিবছর জানুয়ারিতে আমাদের সবার কানেই বাজে। সেই সাথে কানে আরো বাজে খুব দ্রুত আমার মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছি। আমাদের ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ফান্ড তিন হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। দরিদ্র শিশুদের জন্য সরকারের বিভিন্ন পলিসি আছে। ধনী শিশুদের জন্য আছে বিদেশ আর ইংরেজি মাধ্যম। কিন্তু আমরা যারা মধ্যবিত্ত!! আমাদের জন্য কী আছে? দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা?

না ভাববেন না। যার কেউ নেই তার আল্লাহ আছে। আমার শিশু হয়তো গত বছরের ড্রেস পড়েই স্কুলে যাবে। একটু ছোট হবে তাতে কী? জুতায় পা ঢোকানোর পর বুড়ো আঙুলটা একটু বাঁকা হয়ে থাকবে তাতে কী এমন আসে যায়? হয়তো ওর মা মূল পাঠ্যপুস্তকের বাইরের বইগুলো অন্য কারো কাছ থেকে সংগ্রহ করে নেবে, তাতেও কিচ্ছু হয়নি। মলাট দিলে সবই নতুন বই। আমার শিশুকে পড়তেই হবে। তিনপুরুষ ধরে আমাদের পেশা লেখাপড়া শেষে চাকরি করা। হুট করে তো পেশা পরিবর্তন করতে পারি না আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read In English»
Close