সময় সংবাদ

সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ৮ কিলোমিটার রাস্তা বানিয়েছেন এক বাবা….

ভারতের উড়িষ্যার এক প্রত্যন্ত জেলা কন্ধমাল। পাথুরে রুক্ষ জমি, অনুন্নত পরিবেশ সেই গ্রামের। পাকা রাস্তাতো দূরে থাক, একটা কাঁচা রাস্তা পর্যন্ত নেই। শিক্ষার আলো পৌছায়নি এতদিনেও। এ গ্রামের বাসীন্দারা দুবেলা পেটের ভাত জোটাতেই হিমসিম খায়। সেখানকার ছোট্ট একটি গ্রাম গুমসাহিতে বাস করেন জলন্ধর নায়েক। পেশায় সবজি বিক্রেতা। অক্ষর-জ্ঞানের ছিটেফোঁটাও পড়েনি তার জীবনে। কখনো পড়াশোনা করার সুযোগও পাননি। যে কারণে মনের ভেতর একটা সুপ্তবাসনা কাজ করে জলন্ধরের, সন্তানদের শিক্ষিত করে তুলবেন তিনি।

শুরু থেকেই তার ইচ্ছে ছিল ছেলেকে পড়াশোনা করাবেন। বড় মানুষ বানাবেন। ছেলে যতদূর পড়তে চায় ততদূর পড়াবেন। কিন্তু গ্রামে সে ব্যবস্থা নেই। পড়তে হলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেটে গিয়ে দূরের স্কুলে ভর্তি হতে হবে। একটা বাচ্চা ছেলের জন্য এটা প্রায় অসম্ভব। তার উপর জঙ্গুলে পাহাড়ি এলাকা। অনেক ভেবে একটা উপায় বের করেন জলন্ধর। প্রায় অভাবনীয় এক পরিকল্পনা। গ্রামের পাথুরে পাহাড় কেটে, জঙ্গল সাফ করে রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি। যাতে করে সহজেই তার ছেলেরা স্কুলে যেতে পারে।

পরিকল্পনার পর পরই জলন্ধর শাবল-খুন্তি নিয়ে নেমে যান কাজে। শহর বরাবর সোজা রাস্তা বানাবেন তিনি এটাই ছিলো একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। হ্যাঁ, জঙ্গল সাফ করে, পাহাড় কেটেই বানাতে হবে সেই রাস্তা। গ্রামের লোকজন কিংবা সরকারি লোকজনের কাছে ধর্ণা দিয়ে লাভ হয়নি। তাই নিজেই কাঁধে তুলে নিলেন রাস্তা বানানোর দায়িত্ব। সেই যে শুরু করলেন, গেল দুই বছর তিনি নিয়মিত ৮ ঘণ্টা ধরে পাথর কেটে রাস্তা তৈরির কাজ করে গেছেন তিনি। প্রতিদিন সকাল হলেই ঘর থেকে বের হতেন জলন্ধর। ফিরতেন প্রায় শেষ বিকেলে। রোদ, বৃষ্টি, শীত কোনো কিছুর পরোয়া না করে দুরন্ত গতিতে কাজ চালিয়ে গেছেন তিনি। প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস, জেদ, একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা আর নিজেকে প্রতিমুহূর্তে ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। জলন্ধরও সেটাই করেছেন।

অবশেষে ফল পেলেন তিনি। একদিন পেছনে ফিরে দেখেন দিনভর মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জঙ্গল সাফ করে, পাহাড় কেটে প্রায় ৮ কিলোমিটার রাস্তা বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। তার এই কৃতিত্বের কথা স্থানীয় একটি সংবাদপত্রে ছাপানো হলে টনক নড়ে প্রশাসনের। জলন্ধরকে সেখানকার সরকারি দপ্তরে ডেকে নেয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গেই ঘোষণা করা হয় তার এই অনবদ্য অবদানের জন্য বিশেষ সম্মান পাবেন জলন্ধর। রাস্তাটি যাতে ভালো করে নির্মাণ করা হয় তার ব্যবস্থা করে স্থানীয় প্রশাসন। স্বার্থক হয় জলন্ধরের এতোদিনের পরিশ্রম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Read In English»
Close