ধর্ম ও ইসলামিক জীবন

কারো মৃত্যুর পরপরই সামাজিক মাধ্যমে দোয়া চাওয়া কি ঠিক?

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো তথ্য হাজার হাজার ব্যবহারকারীর কাছে চলে যায়। বিভিন্ন ধরনের তথ্য প্রচার করা ছাড়াও গণসচেতনতামূলক ছোট ছোট পোস্ট, সাহায্য-সহযোগিতার জন্য আবেদন, যেমন—কোনো ব্যক্তির রক্তের প্রয়োজন হলে, পোস্ট করা মাত্রই হয়তো সংশ্লিষ্ট গ্রুপের ব্যক্তি রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাচ্ছে। হতে পারে বন্যার্তদের জন্য ত্রাণের চিত্র কিংবা ভয়াবহ সংবাদগুলোর ছবি পোস্ট করে গণমানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। এগুলো নিঃসন্দেহে অনেক ভালো মানের কাজ।

এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ভালো দিকের পর আবার আছে কিছু মারাত্মক খারাপ দিক। আর এসব খারাপ দিকের অধিকাংশই হয়তো ব্যবহারকারীরা অবচেতন মনে করছেন। অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেও করতে পারেন। তবে অবচেতন মনে করা একটি ভয়ঙ্কর খারাপ দিক হচ্ছে কারো মৃত্যুর সংবাদ পোস্ট করা। এই পোস্টটির ওপরই মূলত আমার লেখার ইতি টানব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন ছিল না তখন কারো মৃত্যুর সংবাদ দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনের কাছে পৌঁছাত লোক মারফত। যাকে বার্তাবাহক হিসেবে পাঠানো হতো তিনি হয়তো মৃতের মেয়ের বাসায় গিয়ে সংবাদটা দিতেন একটু ভিন্ন কৌশলে। অনেকটা এমন—‘বড় চাচার শরীরটা তো কয়েক দিন থেকে খুবই খারাপ, ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। তাই চাচি আমাকে পাঠাইছে, যেন আপনাকে আজকেই সাথে করে নিয়ে যাই।’ এ ধরনের কথায় মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়িও ধারণা করে নিতেন হয়তো কোনো খারাপ সংবাদ আছে। তাই আড়ালে নিয়ে তথ্যটার গভীরতা পর্যালোচনা করে তারাও ছেলে বউকে বোঝাতেন বেয়াইকে আসলে দেখতে যাওয়া উচিত। কতদিন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না…।

কয়েক দিন আগে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসে আছি। পাশে স্বামী-স্ত্রী বসা। তারা স্ত্রীর বাবার বাড়ি যাচ্ছেন। হঠাৎ স্বামীর কাছে ফোন এলো। স্ত্রী আড়ি পেতে শুনেই অটোরিকশায় হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। অটোরিকশার বাকি যাত্রীরা বিভিন্নভাবে মহিলাকে সান্ত্বনা দিয়েও কান্না থামাতে পারেননি। পুরো রাস্তায় ওই ছোট্ট বাহনটায় একজন মহিলা কেঁদে চলেছেন। তখন কেমন লাগবে আপনার? সে সময় স্বামী তার স্ত্রীর কাছে শ্বশুরের মৃতের কথা গোপন রেখে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছিলেন। সেখানে এক মোবাইল ফোন কলেই সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। এমন করে হঠাৎ কারো মৃত্যুর সংবাদ দেওয়া যায় কি?

আসলে এগুলোতে মোবাইল ফোন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দোষ দেওয়া যায় না। দোষ হচ্ছে আমাদের অবচেতন মনের। শোক সংবাদটা না হয় একটু দেরিতেই আসুক। দূর-দূরান্তে স্বামীর সংসারে থাকা যে মেয়েটি হয়তো কয়েক বছর ধরে বাবা-মাকে দেখেনি। দেখেনি তার এলাকার পুরনো পুকুর, শৈশবে কাটানো নদীর ঘাট, খেলার সাথিদের। তাই হয়তো নিজের এলাকার অনেককেই বন্ধু তালিকায় রেখেছে মায়ের গ্রাম দেখবে বলে। আর আপনি হঠাৎ সংবাদ দিয়ে দিলেন তার বাবা মারা গেছে সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী! ভেবেছেন কি সেই সময় মেয়েটির মানসিক অবস্থা কি হতে পারে?

সুতরাং দোয়া চেয়ে পোস্টটা পরেও দিতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গেই কি দিতে হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *