জাতীয় সংবাদ

এমপিওভুক্তি আন্দোলন: শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে তাদের বিশ্বাস নেই শিক্ষকদের… 

এমপিওভুক্তির দাবিতে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর থেকে প্রেসক্লাবের সামনে লাগাতার কর্মসূচি শুরু করেন। গত ৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তার তৎকালীন একান্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান সেখানে গিয়ে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেন। এরপর শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন। তবে শিক্ষকেরা ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তাদের এমপিওভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় তারা আবারো আন্দোলনে যাবেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে কোনো বরাদ্দ না থাকায় শিক্ষকেরা নতুন করে কর্মসূচি দেন। আবারো আন্দোলনের ঘোষণা দেন।

সে অনুযায়ী ১০ জুন প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে যান শিক্ষক-কর্মচারীরা। কিন্তু অনুমতি না থাকার কথা বলে শিক্ষকদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এরপর গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বাজেটে উল্লেখ না থাকলেও বেসরকারি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি হবে। এ নিয়ে আন্দোলন করার প্রয়োজন নেই। বেসরকারি শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। এজন্য শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষকদের আন্দোলন না করার অনুরোধ জানান। তবে শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে তাদের বিশ্বাস নেই। কারণ তিনি অনেকবারই এমন আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু কথা রাখেননি। উনার ইচ্ছাও নেই এমপিও করার।

শিক্ষক নেতারা বলেন, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা ন্যূনতম বেতন-ভাতাও পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় অনেক শিক্ষক পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় তারা কীভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াবেন?

আন্দোলনে অংশ নেয়া দিনাজপুরের ভাদুরিয়া মডেল নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০০১ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি বিনাবেতনে শিক্ষকতা করছেন। সব যোগ্যতা অর্জনের পরও গত ১৭ বছরে স্কুলটি এমপিভুক্ত হয়নি। এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ডিসেম্বরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শীতের মধ্যে আন্দোলন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সরকারের আশ্বাসে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে কোনো বরাদ্দ না রাখায় তিনি হতাশ হয়েছেন। নিরুপায় হয়ে ঈদের আগে পরিবার রেখে এই আন্দোলনে এসেছেন তিনি।

এই শিক্ষক আরো বলেন, প্রতিবছর বাজেটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে বরাদ্দ দেবে সেই আশায় বুক বেঁধে থাকতে থাকতে ১৭ বছর পার হয়ে গেছে। এখন চাকরির বয়সও নেই। ক্লাসের ফাঁকে কৃষিকাজ করে সামান্য আয়ে সংসার সামলাতে পারছি না। কোনো ঈদেই স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নতুন কাপড় কিনে দিতে পারিনি। এবার সরকার আশ্বাস দিয়েছিল এমপিওভুক্ত করবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শুনে হতাশ হয়েছি। ঈদের আগে তিনি আমাদের রাজপথে ঠেলে দিয়েছেন।

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার হাজী বিশারদ আলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা স্কুলে পড়াশোনা করে। তাদের অনেককেই বিনাবেতনে পড়াতে হয়। কেউ কেউ বেতন দিলেও তা খুবই কম। এই টাকা দিয়ে একজন শিক্ষকের বেতন দেয়া সম্ভব হয় না। এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে ২০০৩ সাল থেকে বিনাবেতনে চাকরি করছি। এখন সংসার হয়েছে। সন্তানরা পড়াশোনা করছে। বিনাবেতনে চাকরি করায় তাদের খরচ চালাতে পারছি না।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট বক্তব্য বা গেজেট প্রকাশের ঘোষণা না আসলে শিক্ষক-কর্মচারীরা রাজপথে পবিত্র ঈদুল ফিতর পালন করবেন।

তিনি বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ১০ বছর ধরে বলে আসছেন বাজেটে বরাদ্দ থাকলে এমপিওভুক্ত করা হবে। অথচ নতুন করে আবারো মন্ত্রী মিথ্যাচার করছেন। বলছেন, এমপিওভুক্তর জন্য বাজেটে বরাদ্দ জরুরি নয়। আর কত দিন এভাবে শিক্ষকদের রাস্তায় থাকতে হবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close